নিস্তরঙ্গ চাঁদের আলোয় – মঞ্জুরুল ইমরান

নিস্তরঙ্গ চাঁদের আলোয়
মঞ্জুরুল ইমরান

অকারণ উদ্দেশ্যহীন ঘরের ভিতরে পায়চারি করতে লাগলেন দ্রাবিড়। সুবহে সাদিকের বেশ আগেই ঘুম ভাঙ্গাতে বিরক্ত হলেন না, বরং আতঙ্কের হাত থেকে বেঁচে গেলেন। আর সেই সাথে পায়চারি করতে করতে কিছুটা স্বস্তিবোধ করলেন। সুনসান নিরব রাত। হঠাৎ-ই পায়চারি বন্ধ করে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। মুহূর্তের এই নির্জন, নিভৃত, নিস্তব্ধ পৃথিবীর মাঝে একাকী শূণ্যতার অনুভব নিয়ে উদাসীন চোখে জানালার বাহিরের তাকালেন। আকাশে বেশ কাসার থালার মত মস্ত বড় উজ্জল ঝলমলে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভিতর এসে পড়ছে। গড়াগড়ি খাচ্ছে পুরো ঘর, পুরো শরীর। ধীরে ধীরে এক ভিন্ন খেলার ছলে সেটাও হারিয়ে যেতে লাগলো, বিলীন হতে থাকলো সেই রুপালি আলো। আস্তে আস্তে মেঘে ঢেকে গেল চাঁদটা। যেন তা মেঘ নয়, বিষন্ন কালো ধোঁয়া ঘিরে ফেলছে চাঁদটাকে। তার বুকের বাম পাশের ব্যাথাটা আবার অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেলো। বুকের ভেতরে এক ধরনের ফাঁকা ফাঁকা অনভব করলেন, ঠিক শূণ্যতা। যেন কেউ গুলিবিদ্ধ করে সেই স্থানটুকু ফাঁকা করে দিয়েছে। আর সেই ফাঁকাতেই এক ঝাঁক ব্যাথার অনুপ্রবেশ। মাঘ মাসের রাতে গায়ের কাঁথা একটু আলগা হলেই প্রচন্ড শীতের যে অনুভব পাওয়া যায়, ঠিক সেরকম। ব্যাথায় কাঁতর দ্রাবিড়, মনের ভেতরে দমবন্ধকর গুমোট হাওয়া বইছে। এক দীর্ঘ নিঃশ্বাসে হাঁফাতে হাঁফাতে ঘাবড়ে উঠলেন। গা থেকে দরদর করে ঘাম বেরিয়ে আসলো, ঘাবড়ে কাঁতড়াতে লাগলেন বুকের বাম পাশের ব্যাথায়। যেন সেই ভয়, আতঙ্ক, সেই দৃশ্য। যে আতঙ্কে এতটা গভীর রাত কেটেছে। চোখে মুখে আঘাত হেনেছে সেই ঘোর, ঘোর থেকে স্বপ্ন, স্বপ্ন থেকে বাস্তবতার মুখোমুখি। মহা আতঙ্কে কেটেছে সময়। সেই যে এক অসম্ভব দীর্ঘ স্বপ্নের ভেতর থেকে, অনেক কষ্টে বেরিয়ে ছিলেন। যেন তখনো সেই ঘোর, জেগেও যেন স্বপ্নের ঘটনার পরষ্পরের মধ্যে ছিলেন। শরীর কাঁপছিল। ভীষণ জল পিপাসা পাচ্ছিল। টেবিলে একটা ছোট্ট বোতলে জল ছিল। হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। কিন্তু সেটুকু শক্তিও যেন ছিল না। ভীষণ ভয়ের আতঙ্কে কাঁপছিল তিনি। উঠে যে আলো জ্বালাবেন, সে মানসিক শক্তিও ছিল না। এভাবে চুপচাপ কতক্ষণ আচ্ছন্নতার মাঝে শুয়েছিলেন, তা ঠিক জানা নেই। কারণ তখনো স্বপ্নের ঘোর লেপ্টেছিল চোখে। হঠাৎ সেই ঘোর থেকে কখন যে আবার সেই স্বপ্নের ভেতরে ঢুকেছিলেন তাও ঠিক জানা নেই। সেই উদ্ভদ স্বপ্ন। একটা ছোট্ট মেয়ে, গায়ে মার্কিন কাপড় জড়িয়ে এদিকেই হেঁটে আসছে। গাছের সুশীতল ছায়াতলে দাঁড়িয়ে দ্রাবিড়, পর্যবেক্ষকের মতই মেয়েটাকে দেখছেন এক আশ্চর্য চোখে। মেয়েটার ক্রমাগত এগিয়ে আসার পদোন্নতে হাওয়ায় ভেসে আসে এক মোলায়েম গন্ধ। তিনি পরখ করা নাকে ব্যকুল হয়ে শূঁকেন। গন্ধটা বিদেশী সেন্ট বলে জানার আগেই তা হাসনাহেনার গন্ধ বলে মনে হয় তার কাছে। ধন্দে পড়েন তিনি। বুঝে নেয় মেয়েটাকে। জেনে নেয় মেয়েটা এই জগতের কেউ না, সদ্য স্বর্গ থেকে উঠে এসেছে। নয়ত সদা এই কবরের বাসিন্দা। মেয়েটা কাছে আসতেই শুস্মিতার কথা বলে উঠলো, বলল, “শুস্মিতার সাথে দেখা করতে চান?” হতভম্ব দ্রাবিড়, আশ্চর্য দৃষ্টিতে দেখলেন মেয়েটিকে। যেন মেয়েটা তাদের বহু বছর আগে থেকে চেনে। পৃচ্ছা ছাড়লেন মেয়েটিকে, “তুমি শুস্মিতাকে চেনো?” মেয়েটা কোন উত্তর দিল না, বলল, “শুস্মিতা আপনার সাথে দেখা করবেনা।” বলেই আবার চলে গেল মেয়েটা। যেতে যেতে মিশে গেল হাওয়াই। আর ঠিক সে মুহূর্তেই স্বপ্নটা ভেঙ্গে ছিল। ভাঙ্গার পরে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না, এরকম স্বপ্ন কেন দেখলেন! স্বপ্নের সেই ভাবনা নিয়ে চিন্তায় বিমূঢ় হয়ে গেলেন। শুস্মিতা ছিল খুব অভিমানি আর টট্টর। সাক্ষাত হলে হয়তো এ কথায় বলতো, “তুমি পারলে, পারলে এতদিন পর আমার সাথে দেখা করতে? পারলে আমাকে ছাড়া এভাবে নতুন সংসার বাঁধতে! এটা তো কথা ছিল না। কখনও তো আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল না। তবে একা নিঃশ্বার্থের মতো আমাকে ফেলে গিয়েছিলে? কেন? কেন?” কথাগুলো ভাবতে ভাবতে পিপাসার্ত হৃদয়ে শুস্মিতাকে দেখার অস্থিরতা বেড়ে উঠলো। কিন্তু সেটা কি সম্ভব! আজ থেকে পাঁচ বছর আগের ঘটনা। শুস্মিতাকে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিলেন। তারপর সেই নতুন জীবন, নতুন সংসার। খুব সুখে শান্তিতে কাটছিল দিনগুলি। হঠাৎ, এক রাতে ভয়ার্ত ঝাকুনিতে ঘুম ভেঙ্গেছিল তার। আচমকা, তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিছনা ছেড়ে দ্রুত ছুটে গিয়েছিলেন বাহিরে। সমস্ত ভূমির ঝাকুনিতে আর লোকজনের হৈ-হুলোর চিৎকারে যখন বুঝতে পারলেন, ভূমিকম্পের প্রভাবে তাদের দালানটা ফাটল নিয়ে ধসে পড়ছে, তখন সবার সাথে পাল্লা দিয়ে দ্রুত নিজের জীবন রক্ষার্থে দৌড়াচ্ছিলেন। হয়তো তখন ভুলেই গিয়েছিলেন শুস্মিতার কথা। ভুলেই গিয়েছিলেন বিছানায় শুস্মিতা তখনও ঘুমন্ত অবস্থায়। সে ব্যাথা, সে জ্বালাময়ী মুখ, যেন তার হৃদয় ভেদ করেছে। যা সর্বক্ষণ উপলব্ধি করেন।
আস্তে আস্তে আবার মেঘ সরে গেল, কালো ধোঁয়াগুলো উড়ে গেল হাওয়া হয়ে। পূর্ণ আলো নিয়ে ঝলমল হয়ে বেরিয়ে এল সেই চাঁদটা। যেন তা চাঁদ নয়, কোমল মায়াবতী সে মুখ, গভীর চাহনি ভরা সে চোখ, ভোরের স্নিগ্ধ মাখা হাসি, যেন তার হৃদয় ছুঁয়ে দূর থেকে দৃষ্টিপাত করছে। দ্রাবিড় বহুক্ষণ ধরে অপার মুগ্ধতা নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *